মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ | ঢাকা ৮৩°F
ই-পেপার
বাংলা | EN
The American Bangladesh

যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদ

মেনু
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩
ভাষা: বাংলা | EN

বাংলাদেশের অর্থনীতি টানা চাপের মুখে: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাড়ছে ঝুঁকি

দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে নানা চাপের নিচে ঝিমিয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ, রপ্তানি আদেশ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ধারা, গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট এবং ডলারের তারল্য ঘাটতি। গত এক বছরে ছোট–মাঝারি শিল্পের সাড়ে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান খাতও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন সংকটপূর্ণ অবস্থায় রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন হয়ে যাবে। তারা সতর্ক করে বলেছেন—অনিশ্চয়তা বাড়লে অর্থনীতি একেবারে ক্ষয়ের দিকে ধাবিত হবে।

“বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন”—অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইনফোড)-এর নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন,
“রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এখন দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না; সবাই পর্যবেক্ষণ অবস্থায় আছেন।”

তিনি আরও জানান, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বহুদিন ধরে নিম্নমুখী, বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত স্থবির, এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও দ্রুত কমছে—যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়নের জন্য গুরুতর সংকেত।

বেসরকারি খাত সংকুচিত—ঋণ প্রবৃদ্ধির চার বছরের সর্বনিম্ন অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.২৯ শতাংশে, যা গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ না থাকায় উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, ফলে বেসরকারি খাত ছোট হতে শুরু করেছে।

একই সময়ে বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগও কমেছে ৬২ শতাংশ।

৩৫৩টি কারখানা বন্ধ—কর্মহীন প্রায় ১.২ লাখ শ্রমিক

বিজিএমইএ জানিয়েছে, গত ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদি ও চট্টগ্রামে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে কাজ হারিয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক।
শুধু সাভারেই বন্ধ হয়েছে ২১৪টি কারখানা—যার মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠান যেমন ছেইন অ্যাপারেলস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনও রয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর মতে,
“অস্থিতিশীল শ্রম পরিবেশ, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি পোশাকশিল্পকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।”
তিনি সতর্ক করেন—অবস্থার উন্নতি না হলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ রপ্তানি বাজারে পিছিয়ে পড়বে।

আমদানি ও এলসি—দুই খাতেই তীব্র মন্দা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,

  • অক্টোবর মাসে এলসি খোলা হয়েছে ৫৬৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১২.১৫% কম
  • পুরোনো এলসির বিপরীতে বিল পরিশোধও কমেছে ১১.৪৮%

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং ব্যবসায়ী মহলের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির কারণে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শীতের আগে এলএনজি কম আমদানি করাও আমদানি চাহিদা কমার আরেকটি কারণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আখতার হোসেন বলেন,
“এলসি কমার কারণ ডলার সংকট নয়; বিনিয়োগ ও বাজার চাহিদা কমে যাওয়াই প্রধান কারণ।”

দেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশঙ্কা—আইএমএফ, এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা

  • আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে: ২০২৫-২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৯%
  • এডিবির পূর্বাভাস: ৫%
  • বিশ্বব্যাংক বলছে: সংস্কার কার্যক্রম সময়মতো বাস্তবায়িত হলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৪.৮%

সব সংস্থাই বলছে—রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকিতে পড়বে।

রপ্তানির নেতিবাচক ধারা—অর্ডার কমছে মাসে মাসে

ইপিবি জানিয়েছে:

  • অক্টোবরে রপ্তানি আদেশ এসেছে ২২০ কোটি ডলার, যা সেপ্টেম্বারের তুলনায় ৩৯ কোটি ডলার কম
  • ঢাকা অঞ্চলে রপ্তানি আদেশ কমেছে ১৫%
  • চট্টগ্রাম অঞ্চলে কমেছে ২৬%

জুলাই–অক্টোবর মিলিয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮.৫%, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

পুঁজিবাজারে টানা পতন

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা বাজার ছাড়ছেন।

  • গত এক মাসে ডিএসই হারিয়েছে ৪২০ পয়েন্ট
  • শেষ কর্মদিবসে ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৪৭০২ পয়েন্টে
  • সিএসইতেও লেনদেন কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে

আইএমএফের সতর্কবার্তা

১৬ দিনের ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ জানায়—
“সাহসী নীতি গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
তারা শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যুব বেকারত্ব হ্রাস এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

সমাধান কোথায়? অর্থনীতিবিদরা বলছেন—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই মূল চাবিকাঠি

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন,
“রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না। নির্বাচনের আগে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি কেউ নিচ্ছে না।”

ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছে। অর্ডারও কমেছে ১০–১৫%।

সিপিডির এক গবেষকের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়লে পুঁজিপাচারও বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনীতির আরও ক্ষতি করে।

ব্যবসায়ীরা একযোগে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে এক অঙ্কে নামানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে,
“বর্তমান সুদহারে এসএমই বা রপ্তানিমুখী কোনো প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকা কঠিন।”

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

সম্পর্কিত সংবাদ

আরও খবর
সকল স্বত্ত্ব @ বস্টন বাংলা