বিদেশের শ্রমবাজারে ধসের আশঙ্কা: সংকুচিত হচ্ছে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের পরিসর
বাংলাদেশের প্রধান চারটি শ্রমবাজার—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানের মধ্যে বর্তমানে কেবল সৌদি আরবেই সীমিতভাবে কর্মী পাঠানো যাচ্ছে। অন্য তিনটি দেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই বাজারগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, সৌদি বাজারেও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জটিলতা।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মী গেছেন প্রায় ৮ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ জন, যা আগের দুই বছরের তুলনায় যথাক্রমে ৭.৫% ও ১৭.৮৫% কম। ২০২২ ও ২০২৩ সালের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন যথাক্রমে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ও ৯ লাখ ৮৯ হাজারেরও বেশি কর্মী। যদিও গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এই খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি এবং ভিসা নীতির পরিবর্তনের কারণে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানসহ মোট ৯টি শ্রমবাজার এখনো বন্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা পুনরায় চালু করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
বায়রার (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। নতুন বাজার গবেষণা ও কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া এই খাত টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
সৌদি বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হলেও সেখানেও নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় ৬৮% সৌদিতে যাচ্ছেন। তবে এখন ‘তাকামুল সনদ’ নামের দক্ষতা পরীক্ষায় পাস ছাড়া কোনো কর্মী সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন না।
এই পরীক্ষার খরচ কর্মীপ্রতি প্রায় ৫০ ডলার (৬১০০ টাকা), যা অনেকের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দাবি, এই সনদ কেবল দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের নীতিমালা পরিবর্তনের ক্ষমতা বাংলাদেশের হাতে নেই বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
বন্ধ থাকা শ্রমবাজারে অচলাবস্থা
সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানসহ বেশ কয়েকটি দেশ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আগেই শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এসব বাজার পুনরায় খোলা সম্ভব হয়নি। এমনকি, একাধিক বৈঠক সত্ত্বেও মালয়েশিয়া ও ইউএই বাজার পুনরায় চালুর কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, দূতাবাস সংকট ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে ইউরোপের বাজারেও প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাপান সেলে ধীরগতি, লক্ষ্যের কাছাকাছি নয়
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কর্মী জাপানে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে “জাপান সেল”। কিন্তু বাস্তবে গত ৯ মাসে জাপানে গেছেন মাত্র ৯৬২ জন কর্মী।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬২টি রিক্রুটিং এজেন্সি গত ছয় মাসে একজন কর্মীও পাঠাতে পারেনি। ফলে, মন্ত্রণালয় এসব এজেন্সির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন তারা কর্মী পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে।
মালয়েশিয়া গমনে অনিশ্চয়তা
গত বছর মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ১৭ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রথম ধাপে ৮ হাজার কর্মীকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। তবে এখনো নিয়োগদাতা পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র না আসায় তাদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) জানায়, প্রশিক্ষণ, সাক্ষাৎকার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ফ্লাইট প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন না হলে এই কর্মীদের পাঠানো সম্ভব নাও হতে পারে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।