ব্যবসায়ীদের দুরবস্থা: আস্থা সংকটে অর্থনীতি, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
দেশের ব্যবসায়ী সমাজ আজ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পরও তারা পাচ্ছেন না শান্তি, স্বস্তি বা আস্থার নিশ্চয়তা। বরং নানা দিক থেকে ঝুঁকি ও চাপ আরও বেড়ে গেছে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এই উদ্যোক্তারা সরকারের কাঙ্ক্ষিত মনোযোগের বাইরে থেকে গেছেন—এমনই অভিযোগ তাদের।
শীর্ষ পর্যায়ের অনেক ব্যবসায়ীকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংক হিসাব জব্দ করা এবং মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করার মতো ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই এমন পদক্ষেপে তারা মনে করছেন—এটি আসলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি অবিশ্বাস ও অবমূল্যায়ন।
অন্যদিকে ব্যবসা পরিবেশে যোগ হয়েছে একের পর এক সংকট। উচ্চ সুদ, গ্যাস-সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং মব-সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিনিয়োগে ভাটা, কর্মসংস্থানে মন্দা
বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান নেই বললেই চলে। বরং প্রতিদিনই মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপির তালিকায় পড়েছেন। যদিও সরকার তাদের পুনরুদ্ধারে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, কিন্তু অভিযোগ রয়েছে—এ সুবিধা মাত্র কয়েকজন পেয়েছেন, অধিকাংশই বঞ্চিত হয়েছেন।
শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো টার্গেট
ব্যবসায়ীদের দাবি, কিছু প্রভাবশালী মহল সরকারের কাছে ভুল তথ্য সরবরাহ করে কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করেছে। তাদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া হওয়ার গুজব ছড়ানো, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করার কারণে বিপুল ক্ষতি হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত তখনও আসেনি।
অর্থনীতির সার্বিক চিত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ, যা আগের বছরের চেয়ে কম। বেসরকারি বিনিয়োগও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে নতুন করে আরও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়তে পারে।
উদ্যোক্তাদের দাবি
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন বলছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। তারা মনে করেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্ভব নয়।
ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট তাসকীন আহমেদ মনে করেন, “সরকার যদি দ্রুত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করে এবং একটি বড় ব্যবসায়ী সম্মেলনের আয়োজন করে, তবে আস্থা ফিরতে পারে।” একইসঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সতর্ক করে বলেছেন, “শিল্পকে টিকিয়ে না রাখতে পারলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।”
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেছেন, তাদেরকে ঢালাওভাবে ‘দোসর’ বানানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে সরকারি অফিস, এনবিআর কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজ চালাতে না গেলে ব্যবসাই সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, ভয়ভীতি, মামলা ও চাঁদাবাজির কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
সার্বিক চিত্র
দেশের অর্থনীতিকে যতোটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তার নেপথ্যে ব্যবসায়ীদের বিরামহীন শ্রমই মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু তাদের যদি অব্যাহতভাবে হয়রানি করা হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হবে, দাম বাড়বে, মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচিত উদ্যোক্তাদের আস্থায় রেখে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া। নইলে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, আর সেই চাপ গিয়ে পড়বে দেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।