চীনের বিশাল বাজারে রপ্তানির নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন দিগন্ত এখন চীনের বিশাল বাজার। পোশাক খাতের বাইরে চামড়া, পাট, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, কাঁকড়া ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার মতো বিভিন্ন খাতে দ্রুত বাড়ছে সম্ভাবনা।
বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার মান উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানসম্মত চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার ও কৃষিপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে চীনে ইতোমধ্যে কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি হচ্ছে, যা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশ থেকে আম ও কাঁঠাল আমদানি করার আগ্রহও জানিয়েছে।
চামড়া ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যে নতুন দিগন্ত
ব্যবসায়ী নেতা মামুন মৃধা বলেন, “চামড়া, হিমায়িত মাছ, পাট ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিপুল সম্ভাবনা আছে। যদি আমরা চীনের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করি, তবে সেখানে বড় ধরনের বাজার তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “চীনের বাজারে টিকে থাকতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, লজিস্টিক সুবিধা ও রপ্তানি নীতি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।”
চিংড়ি ও কাঁকড়ায় বাড়ছে আগ্রহ
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি তরিকুল ইসলাম জহির জানান, খুলনা অঞ্চল থেকে বর্তমানে হিমায়িত চিংড়ি ও সীমিত পরিমাণে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে চীনে। তবে ব্যাংক সুদহার, রপ্তানি খরচ ও জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া রপ্তানিকারকদের বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “ভারত মাত্র ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করে, অথচ আমরা দ্বিগুণ জমিতে চাষ করেও সমান ফলন পাই না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফিশ ফিডের দাম ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে ক্ষতি হচ্ছে।”
তাঁর মতে, চিংড়িকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা ও সরকারি সহায়তা বাড়ালে নতুন বাজার তৈরি সম্ভব।
চীনে খাদ্যপণ্যের রপ্তানির সম্ভাবনা
প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা বলেন, “চীনে আমাদের বিস্কুট, জুস ও কনফেকশনারি পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানিতে পরিবহন খরচ কম, কারণ চীন থেকে ফেরত আসা কনটেইনারগুলো সাধারণত খালি থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “চীনের ভোক্তাদের রুচি ও অভ্যাস অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন ও আকর্ষণীয় প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে।”
রপ্তানি বৃদ্ধিতে নতুন পণ্য ও কৌশল প্রয়োজন
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে রপ্তানিতে নতুন পণ্যে মনোযোগ দিতে হবে। চীন লো-এন্ড পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাই আমাদের মিডিয়াম ও হাই-এন্ড পণ্যে গুরুত্ব দিতে হবে।”
তিনি বলেন, “ভিয়েতনামের তুলনায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। চীনের বাজারে প্রবেশে মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।”
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) আলোচনায় অগ্রগতি
চীনের বাজারে কিছু অশুল্ক বাধা ও মান সনদ জটিলতা বাংলাদেশের রপ্তানির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশই এখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, “FTA কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য আসবে। তবে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে।”
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, “FTA একধরনের দ্বিমুখী তলোয়ার। এতে দেশীয় শিল্প চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চুক্তির আগে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।”
রপ্তানি সম্প্রসারণে করণীয়
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, “চীনের মতো বিশাল বাজারে প্রবেশে রপ্তানিকারকদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নীতি সহায়তা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ রপ্তানিতে বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবে।”
অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেন, “চীনে রপ্তানিমুখী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। এতে দেশে উৎপাদন বাড়বে, একই সঙ্গে চীনা বাজারে প্রবেশ সহজ হবে।”
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।