এক রাতেই বদলে গেল দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক: কূটনীতির উৎসব থেকে উত্তেজনার সাউথ ব্লক
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মাত্র এক রাতের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেল ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের আবহ। যে শহরটি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের উদযাপনে মুখর ছিল, ঠিক তার পরদিন সকালেই সেই বন্ধুত্বের আবরণে ভাঙনের স্পষ্ট শব্দ শোনা গেল।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহর আমন্ত্রণে আয়োজিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তাসহ শীর্ষ থিংকট্যাংকের গবেষক ও প্রভাবশালী সাংবাদিকরা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, পারস্পরিক ত্যাগ আর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আশাবাদ—সব মিলিয়ে পরিবেশ ছিল আবেগঘন।
কিন্তু সেই আবহ বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। রাত পেরোতেই বুধবার সকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাউথ ব্লকে ডেকে পাঠায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে। কূটনৈতিক ভাষায় জানানো হয় একাধিক আপত্তি ও উদ্বেগের কথা।
ভারতের সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনকে ঘিরে নিরাপত্তা হুমকির আশঙ্কাই ছিল এই তলবের প্রধান কারণ। তবে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ভারত-বিরোধী বক্তব্য এবং ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্যও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এর আগের রাতেই, চাণক্যপুরীর বাংলাদেশ হাই কমিশনে আয়োজিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘অর্গানিক ও বহুমাত্রিক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মাটিতে শহীদ হওয়া ১৬৬৮ জন ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
অনুষ্ঠানে ভারতের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, একাধিক সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রখ্যাত থিংকট্যাংকের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সম্পর্কের গভীরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রাষ্ট্রদূত পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন এবং সেখানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও ট্যাগ করেন।
কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁকে তলব করে কড়া বার্তা দেয়।
ভারতীয় কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতকে জানান, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ভারতীয় দূতাবাসকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ ও হুমকির ঘটনাগুলো দিল্লির চোখে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
এর আগে ঢাকায় ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাই কমিশন’ কর্মসূচি, ফেলানী খাতুনের নামে সড়ক নামকরণ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতকে ঘিরে কিছু রাজনৈতিক মন্তব্য দিল্লির দৃষ্টিতে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারত মনে করছে, এসব বক্তব্য তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাম্প্রতিক দেড় বছরে অন্তর্বর্তী বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের বর্তমান সরকারের মধ্যে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্রদূত তলব, বিবৃতি এবং অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। বুধবারের এই তলব সেই টানাপোড়েনেরই সর্বশেষ উদাহরণ।
অথচ এর ঠিক আগের সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান ছিল একেবারেই ভিন্ন ছবি। মুক্তিযুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের স্মৃতি, প্রবীণ কূটনীতিক এম কে রাসগোত্রার অবদান স্মরণ এবং অতীতের গৌরবময় অধ্যায় যেন আবার নতুন করে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
অনেক ভারতীয় পর্যবেক্ষকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের যৌথ ইতিহাসকে আড়াল করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে বিজয় দিবস উদযাপন ছিল একটি ইতিবাচক বার্তা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—কূটনৈতিক উৎসবের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যখন টিভি পর্দায় ভেসে ওঠে ‘বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতকে জরুরি তলব’, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।